মিরপুরে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সার্ভেয়ার মতিন খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

মিরপুরে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সার্ভেয়ার মতিন খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

রফিক চৌধুরী:

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মিরপুর-২ উপবিভাগে কর্মরত সার্ভেয়ার মো. মতিন খানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি একটি প্রভাবশালী দালালচক্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

অভিযোগের ধরন ও কার্যক্রম
অভিযোগে বলা হয়েছে, মতিন খান অফিসের কিছু অসাধু প্রকৌশলীর সহযোগিতায় বছরের পর বছর সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে আসছেন। বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে তিনি সরকারি সম্পত্তি থেকেও ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন।

তদন্তে নেমে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পান। এমনকি তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, মতিন খান অর্থের বিনিময়ে সেই অভিযোগপত্র গায়েব করে দেন।

বদলি হলেও একই স্থানে প্রত্যাবর্তন
দুর্নীতির অভিযোগে তাকে একাধিকবার বদলি করা হলেও রহস্যজনক কারণে তিনি বারবার আগের কর্মস্থলে ফিরে আসেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অবৈধ সম্পদের অভিযোগ
মতিন খানের বিরুদ্ধে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। ঢাকাসহ নিজ জেলা সিরাজগঞ্জে তার একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রয়েছে বলেও অভিযোগ।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বরের শেষাংশ ১৩৮২ এবং টিআইএন নম্বরের শেষাংশ ৩৩৯৩১—যা সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে সংযুক্ত রয়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—একজন সাধারণ চাকরিজীবী হয়ে তিনি কীভাবে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন?

সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাড়া আদায়
অভিযোগ রয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি জমি ও স্থাপনা ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪-৫ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রতিটি ঘর থেকে ৫-৬ হাজার টাকা এবং দোকান থেকে ৬-৭ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হয়। এই অর্থ সরকার না পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পকেটে যাচ্ছে।

মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও অভিযোগ
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে মতিন খানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। একইভাবে পূর্বেও একাধিক অভিযোগ দায়ের করা হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগকারী শাকিল আহমেদ জানান, মতিন খান দীর্ঘদিন একই স্থানে থাকার সুযোগ নিয়ে নিয়মবহির্ভূত প্রতিবেদন দাখিল করে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করেছেন।

জমি ও প্লট সংক্রান্ত অনিয়ম
রূপনগর ও মিরপুর এলাকার বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক প্লট, খোলা স্থান ও সরকারি জমি অনিয়মিতভাবে ব্যবহার ও দখলের অভিযোগ রয়েছে।

নির্ধারিত কমিউনিটি সেন্টার ও শিশুপার্কের জায়গায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের জন্য বরাদ্দকৃত প্লটে হাসপাতাল নির্মাণ না করে কার ওয়াশ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক প্লট আবাসিক প্রকল্পে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম
রূপনগর আবাসিক প্রকল্প (১৯৮৪–১৯৮৭) সম্পন্ন হলেও এখনো প্রকল্প সমাপ্তির প্রতিবেদন (PCR) জমা দেওয়া হয়নি। এর ফলে পরবর্তীতে প্লটের শ্রেণি পরিবর্তন করে অনিয়মিত বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মতিন খানের বক্তব্য
এ বিষয়ে মতিন খান বলেন, তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই কাজ করেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না, স্যারদের নির্দেশেই সব কাজ করি।”

ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দুর্নীতি আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হবে।
নবীনতর পূর্বতন